সর্বশেষ সংবাদ

বিদ্যুৎহীন মাটির ফ্রিজ : সোনালী সুখের হাতছানি

এফ শাহজাহান < এশিয়ানবার্তা ডেস্ক > মায়ের সাথে শুধু মাটিরই তুলনা চলে। তাই মা আর মাটি যেন অনন্ত কাল ধরে আমাদের আগলে রেখেছে। যে মাটি আমাদের শেষ ঠিকানা সেই মাটিতেই আছে স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের সকল আশ্রয়। তাই অল্প শিক্ষিত এক কুমোরের মাথায় এসেছিল বিদ্যুত ছাড়াই মাটির ফ্রিজ বানানোর চিন্তা। যেই চিন্তা সেই কাজ। তারপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

মাটি আর মানুষের আত্মার মেলবন্ধন

স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টিকারী ভয়ংকর প্লাস্টিক আর পলিথিনের আগ্রাসনে যখন মরি মরি অবস্থা,তখন মাটিই আমাদের প্রশান্তির আশ্রয়ের হাতছানি দিচ্ছে।

ছোটবেলায় পাড়াগাঁয়ে যারা বেড়ে উঠেছেন,তারা হয়তে দেখে থাকবেন যে, চৈত্রের কাটফাটা তপ্ত দুপুরে দাদি নানীরা মাটির কলস থেকে শীতল পানি খাওয়াতেন। যত গরমই হোক,মাটির কলসে পানি রাখলে তা এতটাই প্রশান্তিময় শীতল হয় যে,যারা দেখেন নি তারা উপলব্ধি করতে পারবেন না।

সেই সব দাদি নানীর মাটির হাড়ি পাতিলের রান্নার মজা এখনো ভুলতে পারিনা। মাটির বাসন কোসনে খাওয়া দাওয়ার সেই সুখ আজো তালাশ করি। সেই মাটি দিয়ে কেন ফ্রিজ বানানো যাবেনা এমনটাই চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন ভারতের এক দরিদ্র কুমার পরিবারের ছেলে মনসুর ভাই।

মাটির কারিগর সেই মনসুক ভাই শেষ পর্যন্ত মাটির ফ্রিজ বানিয়ে দেখিয়ে দিলেন সভ্যতা আর প্রযুক্তি যতই উৎকর্ষতার চরম শিখরে উঠুক না কেন,সুখশান্তির জন্য মাটির কোলেই ফিরে আসতে হেবে।

মাটির ফ্রিজ খাবার ঠাণ্ডা রাখে যেভাবে

প্রযুক্তি খুব সরল। বাইরের বড় পাত্রটির মধ্যে ভেজা বালু ভর্তি থাকে। তার মধ্যে বসানো হয় আরেকটি পাত্র সেটি মূলত রেফ্রিজারেটরের ‘ফুড চেম্বার’। পাত্র দুটি ভেজা বস্তা দিয়ে ঢাকা থাকে।

বাইরের পাত্রে রাখা ভেজা বালুর পানি যখন বাষ্পীভূত হতে শুরু করে তখন ভেতরের পাত্র থেকে তাপ শোষণ করে। এভাবে এটি ঠাণ্ডা হতে থাকে। বৈদ্যুতিক ফ্রিজের মতো তাপমাত্রা বরফশীতল করতে না পারলেও মরুভূমির তীব্র গরমের মধ্যেও ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামিয়ে আনতে পারে।

এতে রাখা ফলমূল, শাক-সবজি কিংবা অন্যান্য খাবার কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো রাখতে পারবেন।

বাঁচবে টাকা বাঁচবে পরিবেশ

মাত্র তিন হাজার টাকার মাটির ফ্রিজে সুস্থ জীবন জাপনের সুযোগ এখন হাতের নাগালে। লাগবে না বিদ্যুৎ,থাকবে না লোড শেডিংয়ের বিভৎস যন্ত্রনার ভয়। বাঁচবে পরিবেশ দুষণ। কমবে বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তর ধ্বংস করার সিএফসি নি:সরণ।এই দু:সময়ে মাটির ফ্রিজ পরিবেশ দুষন মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর একটা উপাদন হতে পারে। খাদ্য সামগ্রী থাকবে দূষণমুক্ত নিরাপদ। থাকবে না স্বাস্থ্যরক্ষার বাড়তি ঝুঁকি। কমে যাবে চিকিৎসা ব্যায়।

বিদ্যুত ছাড়াই চলবে সেই মাটির রেফ্রিজেটর৷ সাবেকি আমলে জল ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবহার করা হত মাটির পাত্র৷ সেই প্রাচীন ধারণাকেই আধুনিকভাবে এনেছেন মনসুকভাই প্রজাপতি৷

কাজেই বিদ্যুৎ বিলের টাকাটাও বেঁচে যাবে। সাশ্রয়ী হবে জীবনযাত্রা। গ্রামীন দরিদ্র পরিবারেও আনবে স্বাস্থকর জীবনের নিশ্চয়তা আর সংসারের স্বচ্ছলতা।

যেভাবে উদ্ভাবন মাটির ফ্রিজ

মাটির ফ্রিজের উদ্ভাবক মনসুকভাই ছিলেন একজন শ্রমিক৷ এখনও পর্যন্ত ভারতের একাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন৷ বিশেষত তাদের কথা মাথায় রেখেই মনসুর ভাই নিয়ে আসেন ধারণাটিকে৷ যেখানে ফ্রিজ তৈরি হয়েছে মাটি দিয়ে৷

যেভাবে শুরু মনসুক ভাইয়ের সাফল্য

স্কুলের খুব ভাল ছাত্র ছিলেন না মনসুরভাই৷ সে কারণেই মাধ্যমিকের খন্ডির আগেই ছিটকে যান পরিধির বাইরে৷ পরিবারের বহু পুরনো মাটির পাত্র তৈরির ব্যবসায় কখনও আগ্রহ দেখাননি তিনি৷ কারণ, মাটির পাত্র তৈরির ব্যবসা এখন প্রায় ব্রাত্য৷ এরপরই, তিনি টালি (টাইল) উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেন৷ পরে, পাকাপাকিভাবে টালি তৈরির কাজে নিযুক্ত হন৷ টালি তৈরির কাজ চলাকালীনই তার মাথায় আসে আইডিয়াটি৷ সেখান থেকেই তিনি মাটির ফ্রিজ বানানোর সিদ্ধান্ত নেন৷

আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘Mitticool’৷ যেটি মাটির সামগ্রী (রেফ্রেজেটর,কুকার,ফিল্টার) তৈরির জন্য বিখ্যাত৷ তার সংস্থায় (Mitticool) সাধারণ গ্রামীন মানুষ ফ্রিজ পেতে পারেন মাত্র ৩,০০০ টাকায়৷

যেভাবে ছড়িয়ে গেলো সারা বিশ্বে

মাটির ফ্রিজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক নীতির, যার ফর্মুলা ঠান্ডা রাখবে ফ্রিজ মধ্যস্থ সামগ্রীকে৷ ভারত ছাড়িয়ে ‘Mitticool’ পৌঁছে গিয়েছে বিদেশের মাটিতেও৷ আফ্রিকা, দুবাইয়ের মতো দেশেও সমাদৃত এই সংস্থার সামগ্রী৷

টাইম ম্যাগাজিনও এই ফ্রিজ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পরে আরো লক্ষাধিক ফ্রিজ নাইজেরিয়া, ক্যামেরন, শাদ, সুদান ও ইরিত্রিয়ায় বিতরণ করা হয়।

পৃথিবীর আর যেসব দেশের মাটির ফ্রিজের প্রচলন আছে

নাইজেরিয়ার অধিবাসী মোহাম্মদ আব্বা নামে এক ব্যক্তি উদ্ভাবন করেছেন এমন এক ধরনের ফ্রিজ যা চালাতে একদম বিদ্যুৎ লাগবে না। নাইজেরিয়া দরিদ্র দেশ। এখানে সব জায়গায় বিদ্যুৎ পাওয়া স্বপ্নের মতো। তাই দেশটির পল্লির অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎবিহীন। সেসব এলাকায় কোনোদিন বিদ্যুৎ পৌঁছাবে কিনা তাও তারা জানেন না। তাই বলে শহরের মতো ফ্রিজ ব্যবহার করার সাধ তাদের পূরণ হবে না? কিন্তু ব্যাপারটি মানতে পারছিলেন না আব্বা। তাই নেমে পড়েন এমন একটি ফ্রিজ তৈরিতে যার জন্য বিদ্যুৎ লাগবে না। তার তৈরি ফ্রিজটি পুরোটাই মাটি দিয়ে তৈরি। শুনে অবাক হচ্ছেন। মোটেও অবাক হবেন না। এতে রাখা ফলমূল, শাক-সবজি কিংবা অন্যান্য খাবার কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো রাখতে পারবেন। (সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক)

বিষ্ময়কর সাফল্যের হাতছানি

আমরা জানি রেফ্রিজারেটর থেকে নিসৃত সিএফসি গ্যাস পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই সিএফসি’র জন্যই ওজন স্তর ফুটো হয়ে অতিবেগুনি রশ্মি আসছে পৃথিবীতে। ফলে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী আর বরফ গলে উচ্চতা বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের। জলবায়ু পরিবর্থনের ঝুঁকিতে রয়েছে গোটা পৃথিব। এই দু:সময়ে মাটির ফ্রিজ পরিবেশ দুষন মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর একটা উপাদন হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিনাম নিয়ে যখন গোটা দুনিয়ায় চলছে আতংক,তখন এই মাটির ফ্রিজ হতে পারে পৃথিবীকে বাঁচানোর অন্যতম উপায়। পরিবেশ দুষণ কমানোর জন্য যখন কোটি কোটি ডলার খরচেও কোন ফল মিলছে না,তখন এই মাটির ফ্রিজ এনে দিতে পারে বিষ্ময়কর সাফল্য।

বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনার হাতছানি
বাংলাদেশে এখনো মাটিা ফফ্রজের প্রচলন শুরু হয়নি। অথচ বাংলাদেশে রয়েছে এর অপার সম্ভাবনা। আর্থিক সংকটে বাংলাদেশের মৃত্তিকা শিল্প যখন বিলুপ্তপ্রায় তখন এই মাটির ফ্রিজ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। দেশের কুমার সম্প্রদায় যখন অভাব অনটনে জর্জরিত তখন এই মাটির ফ্রিজই তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে।
পরিবেশ বান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত এই মাটির ফ্রিজের প্রচুর চাহিদা রয়েছে উন্নত বিশ্বে। সরকারি সহায়তা পেলে মাটির ফ্রিজ রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা আর উদ্যোগের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow