সর্বশেষ সংবাদ

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী হয়েও যে মুসলমান শয়তানের চোখে জংলী

এফ শাহজাহান < এশিয়ানবার্তা ডেস্ক>  পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনীকেও জংলী বানিয়ে ছেড়েছে সভ্যতার শয়তানরা। ইতিহাসে তার দানশীলতা উদারতা আর মহানুভতার অসংখ্য দলিল প্রমান থাকলেও শুধু খাঁটি মুসলমান হওয়ার কারনে তাঁকে জংলীরুপে চিত্রায়িত করার নানা ফন্দি ফিকির করেছেন তৎকালীন সুশীলরা। সেটা সাতশ বছর আগেও যেমন ছিল,আজও তেমনই আছে।

আজকের প্রতিবেদনের বিষয় পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী মানসা মুসাকে নিয়ে। সেই কাহিনী বুঝতে হলে একটু সামনে পেছনে এগুতে হবে।

প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রতিবছর বিশ্বের সেরা ধনীদের তালিকা প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় ঘুরে ফিরে একই ঘরানার সম্পদশালীরা প্রতিবছর সেরা ধনীর তালিকায় জায়গা পান। ফোর্বসের বিশ্বের সেরা ধনী ৫শ জনের একটা তালিকা প্রকাশ করে। সেখান থেকে সেরা একশো সেরা দশ এবং শীর্ষ ধনীর তালিকাগুলো হাইলাইট করা হয়।

ফোর্বসের ঐ তালিকা ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদের মালিক ৬ থেকে ৭ জন ইহুদী। আর বাদবাঁকী অর্ধেক সম্পদের মালিক ৪০ থেক ৫০ জন খৃষ্টান।  কোন কোন বছর এদের মধ্যে ফকীর মিসকিনের মত হঠাৎ দুই একজন মুসলমানের নাম পাওয়া যায় তালিকার সবচয়ে শেষে।

অথচ আজ থেকে ৭শ বছর আগে এই পৃথিবীতে এমন একজন মুসলমান ছিলেন, যাকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত তার মত ধনী অার কেউ হতে পারেন নি। অর্থনীতির ইতিহাসবিদরা বলেন, ভবিষ্যতেও পৃথিবীতে তার মত শ্রেষ্ঠ ধনী আর কেউ হতে পারবে না।

সেই মুসলমানের নাম মানসা মুসা। ৭শ বছর ধরে পৃথিবীর সেরা সব হিসাব বিজ্ঞানী আর অর্থনীতিবিদরা চেষ্টা চালিয়েও তার সম্পদের পরিমানের সীমা নির্ধারণ করতে পারেননি।তাই তাকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী।

বর্তমান বিশ্বের সেরা ধনী হয়েছেন আমাজোনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ১৩১ বিলিয়ন (১৩ হাজার ১০০ কোটি) ডলার সম্পদের মালিক তিনি।

তবে সর্বকালের সেরা ধনীর সম্পদের কাছাকাছিও তিনি নেই।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী খেতাবের মালিক মানসা মুসা ১৪ শতকে পশ্চিম আফ্রিকার এই মুসলিম শাসক এতটাই ধনী ছিলেন যে তার দানশীলতার কারণে একটি পুরো দেশের অর্থনীতিতে পর্যন্ত ধস নেমেছিল।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক  রুডলফ বুচ ওয়ার বলেন,”মুসার সম্পদের যে শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে আসলে তিনি যে কতটা সম্পদশালী এবং ক্ষমতাশালী ছিলেন তা ধারণা করাও কঠিন।”

২০১৫ সালে মানি ডট কমে ডেভিডসন জ্যাকব লেখেন “কারো পক্ষে যতটা বর্ণনা করা সম্ভব তার চেয়েও ধনী ছিলেন মানসা মুসা,”।

২০১২ সালে একটি মার্কিন ওয়েবসাইট, সেলিব্রিটি নেট ওর্থ তাঁর মোট সম্পদের মূল্য ৪০ হাজার কোটি ডলার বলে একটি ধারণা দেয়। তবে অর্থনীতির ইতিহাসবিদরা একমত যে সংখ্যা দিয়ে তাঁর সম্পদের কোন সঠিক ধারণা দেয়া একরকম অসম্ভব।

তিনি ছিলেন ধার্মিক মুসলিম

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে মূসা অধিক পরিচিত ছিলেন তার কথিত হজ্জপালনের জন্য ( ১৩২৪ থেকে ১৩২৫ )। প্রচলিত আছে, তার হজ্জবহরের কাফেলায় রসদপূর্ণ থলে বহনকারী ৬০,০০০ লোক ছিল, সাথে ছিল ৫০০ গোলাম যারা প্রত্যেকে একটি করে সোনার দন্ড বহন করছিল এবং ৮০ থেকে ১০০টি উট ছিল, যেগুলো প্রত্যেকটি প্রায় ১৪০ কেজি সোনার গুঁড়ো বহন করছিলো। তার এই যাত্রাপথে তিনি প্রায় কয়েকশত কোটি টাকা মূল্যের সোনা বিতরণ করেছিলেন। কায়রোতে তিনি এত বেশি স্বর্ণ বিতরণ করেছিলেন যে, বেশ কয়েক বছর ধরে সেখানে স্বর্ণের দাম তুলনামুলকভাবে অনেক কম ছিল।

এরপর থেকেই ইসলাম বিরোধীদের মাথা ঘুরতে থাকে। তারা বুঝে ফেলেন যে মানসা মুসা ভেজাল মুসলমান নন। তিনি খাঁটি মুসলমান। আর খাঁটি মুসলমানকে কখনোই হিরো বনতে দেওয়া যায় না। তাই তখন থেকেই শুরু হয় মানসা মুসারকে জংলী রুপে চিত্রায়িত করার ষড়যন্ত্র।

তিনি ছিলেন দ্বীনের উত্তম দ্বাঈয়ী

মানসা মূসা ইসলাম প্রচারেও সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি একজন অনুগত মুসলিম ছিলেন এবং কুর’আনের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে অনেকগুলো বিদ্যালয় নির্মাণ করেন। তিনি উত্তর আফ্রিকার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী প্রেরণ করতেন।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল

মানসা মূসা ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল । তার রাজত্বকালে রাজ্যব্যবস্থা ও রাজকার্যাবলি নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করেছিলেন। তার রাজত্বকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক স্থিতিশীল ছিলো।

তার পরও তাঁকে জংলী বানালেন যারা

এতকিছুর পরও শুধু খাঁটি মুসলমান হওয়ার অপরাধে তাকে জংলী বলে চিহ্নিত করে ইউরোপীয় সভ্যতার সুশীলরা। এটা আমার কথা নয়। ইউকিপিডিয়ার ভাষ্য বলছে, মানসা মূসার এরকম হজ্জপালনের পর পরই ইসলাম বিরোধীদের টনক নড়তে শুরু করে। তখন থেকেই ইসলামবিরোধীরা তাকে জংলী বলতে শুরু করে ।

ইউরোপীয় মানচিত্র-অঙ্কনকারীরা তাঁদের মানচিত্রগুলোতে মানসা মূসার বিকৃত ছবি আঁকা শুরু করে। মালি সাম্রাজ্যের পতনের পর মানসা মূসার খ্যাতিও কমে যেতে থাকে। এরপর থেকে তাঁকে আর কখনোই মানচিত্রগুলোতে সম্মানিত রাজা হিসেবে আঁকা হয় নি, বরঞ্চ আরও অসভ্যভাবে দেখানো হয়েছে। তাঁকে ইউরোপীয় রাজপরিবারের ব্যাঙ্গাত্মক নমুনারুপে আঁকা হত, যা ছিল একজন রাজমুকুট পরিহিত জংলী ব্যক্তি।

পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ১০ ধনী

•মানসা মুসা (১২৮০-১৩৩৭, মালি সাম্রাজ্যের রাজা) সম্পদের পরিমাণ ধারণা করা সম্ভব নয়।

•অগাস্টাস সিজার (৬৩ খ্রিস্টপূর্ব- ১৪ খ্রিস্টাব্দ, রোমান সম্রাট)৪.৬ লাখ কোটি ডলার।

•ঝাও সু (১০৪৮-১০৮৫, চীনের সং সাম্রাজ্যের সম্রাট শেনজং) সম্পদ অপরিমাপযোগ্য।

•আকবর (১৫৪২-১৬০৫, ভারতের মুঘল সম্রাজ্যের সম্রাট) সম্পদ অপরিমাপযোগ্য।

•এন্ড্রু কার্নেগি (১৮৩৫-১৯১৯, স্কটিশ-মার্কিন শিল্পপতি) ৩৭ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

•জন ডি রকাফেলার (১৮৩৯-১৯৩৭, মার্কিন ব্যবসায়ী) ৩৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার।

•নিকোলাই আলেক্সান্দ্রোভিচ রোমানভ (১৮৬৮-১৯১৮, রাশিয়ার জার) ৩০ হাজার কোটি ডলার।

•মীর ওসমান আলী খান (১৮৮৬-১৯৬৭, ভারতীয় রাজপরিবারের সদস্য) ২৩ হাজার কোটি ডলার।

•উইলিয়াম দ্য কনকারার (১০২৮-১০৮৭, ইংল্যান্ডের রাজা) ২২ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার।

•মুয়াম্মার গাদ্দাফি (১৯৪২-২০১১, লিবিয়ার দীর্ঘ সময়ের শাসক) ২০ হাজার কোটি ডলার।

স্বর্ণের রাজা ছিলেন মানসা মুসা

১২৮০ সালে একটি শাসক পরিবারেই জন্ম মানসা মুসার। তিনি ক্ষমতায় আসার আগে মালি সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন তাঁর ভাই মানসা আবু-বকর। ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে আবু-বকর সিংহাসন ত্যাগ করে একটি অভিযানে বের হন।

চতুর্দশ শতকের সিরীয় ইতিহাসবিদ শিহাব আল-উমারির বর্ণনা অনুযায়ী, আটলান্টিক মহাসাগর এবং তার ওপারে কী আছে তা নিয়ে মারাত্মক কৌতুহলী ছিলেন আবু-বকর। বলা হয় ২ হাজার জাহাজ এবং হাজার-হাজার পুরুষ, নারী এবং দাস-দাসী নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমান তিনি, এবং এরপর আর কখনো ফিরে আসেননি।

প্রয়াত মার্কিন ইতিহাসবিদ আইভান ভ্যান সারটিমার মতো অনেকেই মনে করেন আবু-বকর শেষপর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছুতে পেরেছিলেন। যদিও এর কোন প্রমাণ নেই।

যাইহোক, উত্তরাধিকার সূত্রে ভাইয়ের ফেলে যাওয়া রাজত্বের শাসনভার নেন মানসা মুসা।

তাঁর শাসনামলে মালি রাজত্বের আকার বাড়তে থাকে। তিনি তার রাজত্বে আরো ২৪ টি শহর যুক্ত করেন, যার একটি ছিল টিম্বাকটু।

তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত ছিল ২,০০০ মাইলজুড়ে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে বর্তমান নিজার, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, মালি, বুর্কিনা ফাসো, গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ, গিনি এবং আইভোরি কোস্টের বড় অংশ ছিল তার রাজত্বে।

এই বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর আয়ত্ত্বে আসে মূল্যবান খনিজ সম্পদ- বিশেষ করে স্বর্ণ এবং লবণ।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের হিসেবে মানসা মুসার শাসনামলে তৎকালীন বিশ্বে যে পরিমাণ স্বর্ণের মজুত ছিল তার অর্ধেকই ছিল মালিতে।

আর তার সবটারই মালিক ছিলেন মানসা মুসা।

নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যাথলিন বিকফোর্ড বারজক বলেন “শাসক হিসেবে মধ্যযুগের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটির প্রায় অফুরান যোগান ছিল মানসা মুসার”।

বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো তার সাম্রাজ্যে স্বর্ণ এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা করতো । সেই বাণিজ্য থেকে আরো সম্পদশালী হয়ে ওঠেন মানসা মুসা ।

এযাবত পর্যন্ত ইতিহাসে তার চরিত্রের কলংক লেপনের কিছু পায়নি ইতিহাসবিদরা। অথচ সভ্যতার শয়তানরা তাকে জংলী বানিয়ে ছেড়েছেন।

তথ্যসুত্র : উইকিপিডিয়া / বিবিসি বাংলা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow