সর্বশেষ সংবাদ

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন দিবস বিষয়ে কিছু কথা

মো. কামাল উদ্দিন: ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন দিবস বিষয়ে কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী ! পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারী। এই সৌন্দর্য সঞ্চারীরা বিয়ে-সংসার-তালাক তিনটি শব্দ নিয়ে নারী পথ চলতে হয়। যৌবন প্রাপ্ত হওয়ার পর প্রথম ভাবনা বিয়ে। তারপর সংসার। সংসার-চলা একটি অবাঞ্চিত শব্দ যা বার বার উঁকি মেরে থাকে। তা হলো-অভিশপ্ত ‘তালাক’।

। এ-ই পিতৃতন্ত্রের নির্ধারিত নারীর নিয়তি। এরই মাধ্যমে নারীকে বি¯তৃত জীবন থেকে সংকুচিত করে। তার মনুষ্যত্ব ছেঁটে ফেলে, তাকে পরিণত করা হয় সম্ভাবনাশূন্য অবিকশিত প্রাণীতে। নারীকে দেয়া হয়েছে বিয়ে নামে অনিবার্য স্বপ্ন যার মধ্যে নিহিত থাকে তালাক নামীয় ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। বিয়ের মধ্য দিয়ে নারী প্রবেশ করে একটি পুরুষের সংসার বা পরিবারে; পালন করে পুরুষটির গৃহিনীর ভূমিকা। কিন্তু বন্দি থাকে দাসত্বে। প্রথাগত স্ত্রীর ভূমিকা একটি প্রশংসিত পরিচারিকার ভূমিকা। অবশ্য পুরুষতন্ত্র বিশ্বাস করে না নারীর কোন সম্ভাবনা মনে করে দাসত্বে নারী লাভ করে পরিপূর্ণতা। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিত্তবান শ্রেণীগুলির মধ্যে পুরুষই উপার্জনকারী। পরিবারের ভরণপোষণের কর্তা এবং এই জন্যই তার আধিপত্য দেখা দেয়। যার জন্য কোন বিশেষ কোন আইনগত সুবিধা দরকার পড়ে না। পরিবারের মধ্যে স্বামী হচ্ছে বুর্জোয়া। স্ত্রী হচ্ছে প্রলেতারিয়েত। পুরুষ শাসিত সমাজে নিরীহ নারী কি কিভাবে নির্যাতিত হয়।
নিম্নে উল্লিখিত নারীর উপর অত্যাচারের প্রকারভেদ বুঝে ননঃ –
(ক) কিল, ঘুষি, চড়, থাপ্পর, চুল ধরে টানাটানি, লাথি মারা (খ) লোহা, চাবুক, লাঠি বা অন্য কিছু দিয়ে পেটানো (গ) অন্তঃসত্বার পেটে লাতি ঘুষি বা পেরে এবং বুকের উপর বসে পড়া (ঘ) হাতুড়ি, বটি, খান্তি, ছুরি, কাঁচি, দা ইত্যাদি দিয়ে আঘাত করা (ঙ) ধাক্কা দিয়ে দেয়া বা দেয়ালে মাথা ঠেকানো (চ) স্তন, যৌন, উরু, গালসহ বিশেষ বিশেষ স্থানে আগুন দিয়ে ঝলকানো (ছ) অনিচ্ছা সত্বেও শয্যাসঙ্গিনী হতে বাধ্য করা (জ) বিকৃত রুচিতে বাধ্য করা (ঝ) এসিড নিক্ষেপ করা গলা টিপে হত্যা, শ্বাসরোধ করে হত্যার পর আত্মহত্যা হিসাবে চালিয়ে দেয়া, প্রয়োজনমাফিক খাদ্য ও ঔষধ সরবরাহ না করা, মানবাধিকার হরণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে না দেয়া, নষ্ট চরিত্রের নগ্ন ছবি তোলে বাজারজাত করা, স্বামীর মর্জি মাফিক চলতে বাধ্য করা, বিয়ের আগে ও পরে যৌতুকের জন্য বাধ্য করা, একান্নবর্তী পরিবারের সবাই একটি মেয়ের উপর কাজ চাপিয়ে নির্যাতন করা।
চট্টগ্রামে জনৈক এডভোকেটের চেম্বার-কাম বাসায় এক তালাক অনুষ্ঠান আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার এক দু:সম্পর্কের আত্মীয় সুন্দরী স্ত্রীর সাথে দীর্ঘ ছয় বছরের সংসার জীবনের ইতি টানার অনুষ্ঠান মাত্র। তালাক উত্তর প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার একটি হিসাবের তালিকাও সাথে ছিল। জামাই পক্ষের কয়েকজনকে নিয়ে অনাকাঙ্খিত ডিভোর্স অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলো। সাধারণত বিয়ে অনুষ্ঠানে মিষ্টিমুখ করা হয় কিন্তু এ অনুষ্ঠানে মিষ্টি মুখের পরিবর্তে মুষ্টিবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি। গালে থাপ্পর না খেলেও বিবেকের অদৃশ্য হাতে থাপ্পর খেতে হয়েছে। এডভোকেট সাহেবের বাসায় পূর্ব হতে বসা সমাজের মান্যগন্য অনেকে। তার মধ্যে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। উনিও আমার মতো তালাক প্রদানকারী স্বামীর পক্ষের। ব্যক্তিদ্বয়ের মধ্যে কলেজের এক অধ্যাপক মেয়ের পক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন। তার পিছনে নিচে বসা অবস্থায় দেখতে পেলাম বোরখা পরিহিত এক সুন্দরী মহিলাকে। মুখের উপর কালোছায়ার চাপ “বিমর্ষ দেখাচ্ছে”। (মেয়েরা জীবনে একদিন সবচেয়ে বেশি সুন্দরী হয়। তা হলো বিয়ের দিন)। । ‘কান্না কান্না ভাব’, কে জানে মনের মাঝে কি হচ্ছে। তবুও উপস্থিত সবার সামনে সংসার জীবনে অন্যতম ফসল একটি মাত্র কন্যা সন্তান, তার ভাগ্যের ফলাফল কি হবে কেউ জানেনা। তবুও নারীর প্রথম ভাবনা বিয়ে, দ্বিতীয় ভাবনা সংসার, তৃতীয় ভাবনা অনাকাঙ্খিত তালাক, সেই অভিমতের আলোকে ঘৃনার্থ যে কোন কাপুরুষ মুখে তালাকের তিনটি শব্দ উচ্চারণ করলে একটি নারীর সব কিছুর অবসান ঘটে। কিন্তু ঐ নারী অবাঞ্জিত তালাক শব্দ শুনতে রাজি না। শোনার পূর্বে
তার যেন মৃত্যু ঘটে। তার প্রাণপ্রিয় স্বামী বিগত ছয় বছরে সকল সংসার জীবনের বাস্তবতাকে কল্পকাহিনী হিসাবে ধরে নিয়ে নিষ্পাপ সবুজ শিশুটিকে মা-বাবার আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করার যে অমানুষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সত্যিই দুঃখ ও লজ্জাজনক। আমরা যারা (অসম্পূর্ণ) ডিভোর্স অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম তাদের মধ্যে স্বামীর একান্ত পারিবারিক সদস্য ব্যতীত অন্য সবাই কিন্তু অভিন্ন মত পোষণ করেছে, তালাক নয়-সংসার হবে। বউ বেচারী খুনি মামলার আসামীর মত নীরব নিস্তব্ধ। অসহায় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দেয়াল হেলান দিয়ে অশ্রু ভেজা স্বকরুণ দৃষ্টি নিয়ে তার ভবিষ্যত আশায় চেয়ে আছে। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছে, তালাক নামের জঘন্য কান্ড থেকে মুক্ত হতে। তার উপস্থিতি এক স্বামী ভিক্ষাকারিনীর মতো, সে মুহূর্তে তার সাত রাজার ধনের প্রয়োজন ছিল না, প্রাণপ্রিয় স্বামীর সুন্দর মনের প্রয়োজন, যত দুঃখ কষ্ট হোক সব সহ্য করে নেবে কোন আপত্তি থাকবে না। কারণ প্রবাসী বাবা একবার অনেক কষ্ট করে বিয়ে দিয়েছে। ঘরে একটি ছোট
বোন ও দুঃখিনী মা ব্যতীত আপন কেউ নেই। স্বামীর ভাইদেরকে কাছে পেয়ে আপন ভাইয়ের স্বাদ পাবে মনে করলেও বাস্তবে যে পর কখনো আপন নয়, তা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। এমনিতেও আপনা কোন ভাই না থাকলে যতই সুন্দরী হোক না কেন মেয়েদের সাধারণত বিয়ে হয় না। তবুও এই হতভাগী সুন্দরী রমনীকে এই বিবেকহীন পুরুষ কি ভেবে যেন বিয়ে করেছিল তা ঐ সময়ে না বুঝলেও এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
আমাদের মধ্যে অনেকে একমত, ভুল সংশোধন পূর্বক নতুন ভাবে নতুন মনে গ্রহণ করতে যা যা করার দরকার আমরা সবাই ব্যবস্থা করব। আমরা সবাই পুরুষ নামীয় কাপুরুষরা আধিপত্য ধরে রাখার জন্য সংসারে একবারও ঐ বোবার ভূমিকায় অবতীর্ণ অসহায় মেয়েটাকে কেন তালাক দেবে ? সব দোষ কি মেয়েটা একাই করেছে ? স্বামী অথবা স্বামীর পরিবারের কেউ করেনি ? তাদের সবাই কি দুধের মতো পবিত্র ? স্বামী নামীয় কাপুরুষকে কোন প্রশ্ন করি নাই। ধরে নিলাম মেয়েটার দোষ শতভাগ, কিন্তু ঐ পুরুষের দোষ একভাগও নাই ? সবশেষে বীর পুরুষ স্বামী শুনিয়ে দিল, তবে আমি নিতে পারি শর্ত সাপেক্ষে। তাও আমার ‘মা’ যদি বলে, আমাকে দাসত্বে অঙ্গীকার দিতে হবে !! কথায় বলে না, ভাত খাব তবে ভাতকে গুলিয়ে ‘মদ বানিয়ে খাব’। মদের যেমন নেশা আছে তেমনি বউয়ের মধ্যে একটু নেশা আছে। অসহায় মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে কোন কথা না বাড়িয়ে আমিও একমত হলাম। বীর পুরুষটির মায়ের কাছে আমরা সবাই যাব, যত ধরনের হার মানার দরকার তা মানব। কিন্তু সত্যি কথা হলো এই, নারীকে পায়ে জিঞ্জির পরানোর শর্ত যার নির্দেশে বেঁধে দিচ্ছে, সেও একজন নারী সম্পর্কে শাশুড়ী মা। কোন এক সময় ভরা যৌবনে এই মহিলার মতো সেজেগুজে স্বামীর বাড়িতে এসেছিলো। হয়তো তার স্বামী শ্বাশুর শাশুড়ী, ননদ-দেবররা নির্যাতন করেছিল ঐ নারীর উপর। তা আজকে সময়ে এসেছে ঐ নারীর গর্ভে ধারণকৃত পুত্রের নিগৃহীত পুত্রবধুর মাধ্যমে প্রতিশোধ নেবার। নারীর শক্র নারী যা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে প্রমাণিত হচ্ছে। ঐ শ্বাশুড়ী ইচ্ছা করলে এই অসহায় পুত্র বধুকে সবকিছু ক্ষমা করে দিয়ে আপন করে নিতে পারে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, উপস্থাপক, সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow