সর্বশেষ সংবাদ

দ্রোহের অনলে বিদ্রোহের বারুদ

এশিয়ানবার্তা ডেস্ক < এফ শাহজাহান > আমি ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারী দেখিনি। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের শুধু গল্প শুনেছি। ৬৬ পড়েছি ইতিহাসে। ৬৯ আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে বুলেট,গ্রেনেড,টিয়ারসেল উপেক্ষা করে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মিছিলের সামনে যেতে। আর আজকের শিশুকিশোর বিদ্রোহ আমাকে স্তব্ধ করে দিল । আমাকে বিষ্মিত করলো ।  আমার দ্রোহের অনলে যেন বিদ্রোহের বারুদ ঢেলে দিল।

আজ বগুড়া শহরে শিশুকিশোর বিদ্রোহের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক বাবার অনুভুতিটা আমার বিবেক কে নাড়িয়ে দিল।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি জানতে চেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সীকে জিঙ্গাসা করতেই সে বললো,দেখছেনই তো ছেলেরা মিছিল করছে। আমার ছেলেও আছে ওদের সঙ্গে।

সন্তানকে সঙ্গে করে মিছিলে নিয়ে আসা সেই বাবা বললেন,সবে স্কুল পাশ করা ছেলেটা সারারাত ঘুম পাড়েনি। বাসায় গিয়ে যখন ওকে বললাম কাল দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সে উত্তর দিল, তোমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে পারে। আমাদের বিবেক আছে,আমাদের আন্দোলন বন্ধ হবে না।

সকালসোড়ে ৯টায় দেখি মা তার ছেলেকে ভাত তুলে খাওয়াচ্ছে আর বলছে,বাবা সবধানে থাকিস। পুলিশের সঙ্গে মারামারি করিস না। পুলিশ গুলি করে দিবে কিন্তু।

আমি তো হতবাক। যে মা ছেলেটাকে একাএকা কখনো বাসার নিচে নামতে দেয়না,সে আজ পুলিশের গুলির মুখে ছেলেকে মিছিলে পাঠাচ্ছে ?
আমিতো বেকুব হয়ে গেলাম।
ছেলেটা তার মাকে বললো,একাত্তরের মায়েরা যদি গুলির ভয়ে ছেলেদের আটকে রাখাতো, তাহলে কি এই বাংলাদেশ পেতে ?
ওর মা শুধু মাথা নাড়লো। দেখলাম চোখ বেয়ে পানি পড়ছে তার মায়ের।

হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল ম্যাক্সিম গোর্কির জগৎবিখ্যাত ‘মা’ এর স্মৃতি। মনে পড়লো নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির ‌’ইস্পাত’ এর কথা।
অগত্য আমি উঠে দাঁড়ালাম। কড়া একটা ধমক লাগালাম ছেলেকে। বললাম এখন সময় খারাপ। এখন আইন আদালত বিচার বলতে কিছু নেই।

ছেলেটা উল্টা আমার চোখে চোখ রেখে বললো, সরে দাঁড়াও। উই ওয়ান্ট জাস্টিস।

এই প্রথম দেখলাম,আমার ছোট্ট ছেলেটার মধ্যে দ্রোহের আগুন জ্বলছে। আমি আর পথ আগলে দাঁড়াবার সাহস পেলাম না। শুধু ওর মায়ের ইশারায় ফলো করতে থাকলাম ওকে।

সকালে অফিস যাওয়ার তাড়ার মাঝেও ঘুরে দাঁড়ালাম বগুড়া শহরের সাতমাথায়। মিছিলে মিলিয়ে যাওয়া ছেলেটোকে খুঁজতে লাগলাম।

মুহুর্তের মধ্যে ভিমরুলের চাকে ঢিল দিলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি করে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে গেল সেই ঐতিহাসিক সাতমাথায়। বিক্ষোভ মিছিল ষ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠলো সাতমাথাসহ গোটা বগুড়া শহর।

আমি আর আমার ছেলেটাকে খুঁজে পেলাম না। দিশেহারা হয়ে খুঁজতে লাগলাম। মনে মনে ভাবলাম, পুলিশ গুলি চালালে,প্রথম গুলিটাই যদি আমার ছেলের বুকে লাগে,তাহলে ?

ভয়ে কিছুটা কুঁকড়ে উঠলাম। মনে মনে বললাম আল্লাহ গুলিটা আমার বুকে লাগুক।

পাশে তাকাতেই দেখি এক মা তার দুই মেয়েকে হাত ধরে মিছিলে ঠেলে দিচ্ছেন। ওদের হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড উঁচু করে ধরে ওরা মিছিলে যাচ্ছে।

মুহুর্তেই আমার ভয় কেটে গেল। মনে মনে লজ্জা পেলাম ওই মায়ের সাহস দেখে। যে তার মেয়ে দুটোকে ঠেলে দিল বিক্ষোভ মিছেলে। আমার আবার মনে পড়লো ম্যাক্সিম গোর্কীর ‌‍’মা’ উপন্যাসের কথা। মনে পড়লো নাতাশাকে।

কথা বলতে থাকা সেই বাবাকে দেখলাম পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছছেন। আমি আর তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। এবার নিউচজর সন্ধানে সেখান থেকে সামনে পা বাড়ালাম।

আমি আর কোন কুল কিনারা পেলাম না। মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে উঠলো আশপাশ। যেদিকে তাকাই শুধু দেখি বানের পানির মত ছুটে আসছে বিক্ষুব্ধ শিশু কিশোররা।

বুকের ভেতরের ধুকধুকিটা আরো বেড়ে গেল। রক্ত গরম হয়ে উঠলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিরশির করে উঠছে।

বুঝতে পারলাম,আমার দ্রোহের আগুনে কে যেন বিদ্রোহের বারুদ ঢেলে দিচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow