সর্বশেষ সংবাদ

আয় ভোটার আয়, ভোট দিয়ে যা, মাছ কুটলে মুড়ো দিব…একশ বছরের নির্মম ইতিহাস

এফ শাহজাহান <এশিয়ানবার্তা ডেস্ক>

আয় ভোটার আয় / ভোট দিয়ে যা / মাছ কুটলে মুড়ো দিব / গাই বিয়োলে দুধ দিব…।

ভোটারের আকাল আর ভোটের নিদানকালের এই চরম দু:সময়ে এমন একটি ছড়া দেখে ভাবছেন এইটা আমারই কুকর্ম ?

না, তা নয়, আজ থেকে কমপক্ষে একশ বছর আগে শরৎচন্দ্র পন্ডিত ওরফে দাদা ঠাকুর নামের একজন বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক লিখেছিলেন এই ছড়া।

একশ বছর আগের লেখা এই ছড়া আজ মস্তবড় এক ইতিহাস হয়ে আমাদের সামনে ভেংচি কাটছে।  এই ছড়ার বাস্তবতা আজ কতটা নির্মম সেটা মনে করে দেওয়ার জন্যই একশো বছর আগে লেখা এই ছড়াকে আপনাদের সামনে নিয়ে আসা।

একশ বছর আগে ভোট নিয়ে লেখা এই ছড়া আর আজকের ভোটের চিত্র মেলালেই বুঝতে পারবেন বিগত একশ বছরের আমাদের সমাজ সভ্যতা আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির কতটা উন্নতি হয়েছে। একশ বছর ! মানে এক শতাব্দী ধরে আমরা কতটা এগিয়েছি আমাদের কতটা উন্নতি হয়েছে তারই এক নির্মম ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই ছড়ার মধ্যে।

দাদাঠাকুর সেইসময় একবার প্রকাশ্যেই তাঁর  পত্রিকা ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ থেকে কার্তিকচন্দ্রের হয়ে প্রচার শুরু করলেন। লিখলেন ভোটের গান, ছড়া। এই গান-ছড়ার মধ্যে একটি ‘দাদাঠাকুর’ চলচ্চিত্রের সুবাদে বিখ্যাত হয়ে উঠলো।

শরৎ চন্দ্র পণ্ডিত ২৭ এপ্রিল, ১৮৮১ – ১৯৬৮) বাংলা সাহিত্যের পাঠক সমাজে দাদাঠাকুর নামেই পরিচিত, তিনি ছিলেন একজন বাঙালি কথাশিল্পী ও সাংবাদিক৷ যিনি মুখে মুখে ছড়া, হেঁয়ালী ও হাস্য কৌতুক রচনা করতেন। তাঁর রচিত নানান হাসির গল্প বাঙলা সাহিত্যের অমর কীর্তি৷ তার প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ বোতল পুরাণ।

তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বীরভূম জেলায়। তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দফরপুর গ্রামে বাস করতেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান শরৎচন্দ্র এন্ট্রান্স পাশ করে বর্ধমান রাজ কলেজে এফ.এ. ক্লাসে ভর্তি হন কিন্তু আর্থিক কারনে পড়া সম্পুর্ন করতে পারেননি

জঙ্গীপুরে তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন কিন্তু অত্যন্ত তেজস্বী মানুষ ছিলেন। চারিত্রিক দৃঢ়তায় ছিলেন আধুনিক কালের বিদ্যাসাগর। পন্ডিত প্রেস নামে একটি হস্তচালিত ছাপাখানা স্থাপন করেন তিনি। তার একক প্রচেষ্টায় জঙ্গীপুর সংবাদ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে থাকেন। এই পত্রিকা বাংলার বলিষ্ঠ মফস্বল সাংবাদিকতার প্রথম উদাহরণ।

পন্ডিত প্রেসে তিনিই ছিলেন কম্পোজিটর, প্রুফ রিডার, মেশিনম্যান। সমস্ত কিছুই একা হাতে কর‍তেন। এছাড়া তার প্রকাশিত বিদুষক পত্রিকায় বেরতো তাঁর নিজের রচিত নানা হাসির গল্প ও হাস্য কৌতুক। বিদূষক পত্রিকা রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষন করে। দাদাঠাকুর নিজে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে বিক্রি করতেন এই পত্রিকা।

প্রাক স্বাধীনতার সময় কলকাতার রাস্তায় গান গেয়ে বোতল পুরান পুস্তিকাটি ফেরি করতে গেলে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে আসে, তাঁদের জন্য তৎক্ষণাৎ বানিয়ে ইংরেজিতে গান ধরলেন তিনি। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ খালি গা ও খালি পায়ের এমন এক হকারকে ইংরেজিতে গান গাইতে দেখে হতবাক হয়ে যায় এবং শুধু উৎসাহ জোগাতেই আট কপি কিনে নিয়ে।

তার কাব্যপ্রতিভা, রসবোধ ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছিল সহজাত। ইংরেজি ভাষাতে যে প্যালিনড্রোম বা উভমুখী শব্দ আছে সেরকম বাংলায় শব্দ সৃষ্টি করেছেন। হিন্দি ও ইংরেজিতেও কাব্য লিখেছেন তিনি। তার ব্যাঙ্গাত্বক কবিতাগুলি ছিল সমাজের অত্যাচারী কুপ্রথার বিরুদ্ধে জলন্ত প্রতিবাদ স্বরূপ। স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাকে শ্রদ্ধা করতেন।

দাদাঠাকুর, এই নামেই বাংলা সাহিত্যের পাঠক চেনে শরৎচন্দ্র পণ্ডিতকে। মুর্শিদাবাদের এই বরেণ্য রসিক মানুষটিকে নিয়ে লেখালেখি, চর্চা কম হয়নি। এখনও হয়ে চলেছে নিরন্তর। আসলে তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শিবরামের মতোই ফিরে ফিরে আসেন তাঁর কথার কারিকুরি, রস-রসিকতা নিয়ে। ভোট এলে আরও বেশি করে মনে পড়ে তাঁকে। এ সময়ে ভোট নিয়ে তাঁর মজাদার ছড়া, কীর্তি-কাহিনি পড়লে মন বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়। বর্তমান ভোট-রাজনীতির আঁশটে হাওয়ায় দাদাঠাকুরের ছড়া যেন দখিনা বাতাস।

একশ বছরের আমাদের সমাজ সভ্যতার উন্নতি অগ্রগতির একটা সরল চিত্র মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই দাদা ঠাকুরের ছড়াটি আপনাদের সামনে আনা। ছড়ার প্রতি আরেক নির্বোধ ছড়াকারের যে টান থাকে সেটাও আরেকবার প্রমান করে দেওয়া আর কি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow